একি খেলা আপন সনে (পর্ব ৪-৬)

কঙ্কাবতী রাজকন্যা

পর্ব- ৪

Aparajita
সংসারের হালচাল বুঝবার জন্য সে বয়সটা খুব কাঁচা হলেও আমি খুব তাড়াতাড়িই সে বয়সেই বুঝে গেলাম অনেককিছুই। বুঝলাম এখানে টিকতে গেলে নিজের ভীত শক্ত করতে হবে। কিন্তু পায়ের তলায় মাটিই নেই যেখানে সেখানে কোন ভীতের কথা ভেবেছিলাম আমি, তা কেই বা জানে। আসলে ও বাড়ির ধন সম্পদ অর্থ প্রতিপত্তি কিংবা আলগা জৌলুশ সেসবের প্রতি তো আর কোনো মোহ ছিলো না আমার । সে বয়সে সেটা হবারও কথা নয়। শুধু বুঝেছিলাম এক প্রছন্ন অবহেলা বা উপেক্ষার চোখ সে ঐ বাড়ীর কর্ত্রী অর্থাৎ নতুন বাবার মায়ের চোখসহ এক গাদা কাজের লোকজন সবারই। সবার কাছেই আমি যেন ছিলাম বেশ খানিকটা অবজ্ঞার মানুষ। সেই অবজ্ঞা বা অবহেলাটাই আমার বুকের মধ্যে কাঁটা হয়ে ফুটে থাকতো।
নিজের মুখে মুখ ফুটে কখনও কিছু চাইতাম না কারো কাছে। নিজের মত থাকতাম নিজের মাঝে। শুধু খুব কাছের বা খুব আপন মনে হত রমেশ চাচাকে। উনি আমাকে শিখিয়েছিলেন ফুল আর পাখিদের নাম। আজও নীল অপরাজিতা, প্রগাঢ় ঘ্রাণের গন্ধরাজের ঘ্রান কিংবা হাস্না হেনার স্নিগ্ধতা মানেই আমার ছেলেবেলার রমেশ চাচার তৈরী সেই স্বর্গীয় ঊদ্যান। বসন্ত বৌরী পাখি কিংবা সাদা শঙ্খচিল বা দুপুরবেলা পেয়ারা ডালে বসে "ঘু ঘু" - মন খারাপ করা ডাকের ঘুঘু পাখি চেনাটাও উনারই কাছে। উনি ছাড়া ঐ যে মিষ্টি মত মেয়েটা এ বাড়ির ফুট ফরমাশ খাটা কাজের মানুষই সে। সেও আমাকে অনেকটাই বুঝতো। কোনো এক অদৃশ্য নির্দেশনায় সে আমার থেকে অদৃশ্য দূরত্ব বজিয়ে রাখতো বটে তবে অনেকদিন অনেক অনেক প্রয়োজনে আমি তাকে ছায়ার মত পেয়েছিলাম আমার পাশে। এক রাতে আমার খুব জ্বর আসলো। পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছিলো আমার। ঘোরগ্রস্ত আমি আমার রুম থেকে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অতো জ্বরের ঘোরেও দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম আমি। ফিরে আসছিলাম যখন তখনই দেখলাম শিউলীকে। শিউলী অর্থাৎ ঐ কাজের মেয়েটি। সারারাত আমার শিওরে বসে রইলো সে। মাথায় জলপটি দিলো। পানি খাওয়ালো। ভোরের দিকে যখন আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছিলো। আমি না বলতেও সে ভেজে এনেছিলো মাখন ছড়িয়ে তাওয়ায় সেকা দু স্লাইস ব্রেড আর এক মাগ চা। সেই অমৃত খাবারের স্বাদ আমি আর পৃথিবীর কোথাও কখনও পাইনি।
ইচ্ছে করলেই আমি ফিরে যেতে পারতাম আমার নিজের দাদুর বাড়িতে। নিজের দাবীতে সকলের চোখের মণি হয়ে সেখানে থাকাটা মোটেও অসম্ভব কিছু ছিলো না আমার জন্য। তবুও আমি যেতে চাইতাম না বা চাইনি তার একটা মাত্র কারনই ছিলো আমার মা। মায়ের কাছাকাছি না থাকতে পারলেও একই বাড়িতে আছি। তাকে দেখতে পাচ্ছি সে-ই বা কম কি। আমার নিজের বাবা যতদিন ও বাড়িতে ছিলেন কোনো একটা দিনও আমার মনে পড়ে না বাবার সাথে মাকে হাসিমুখে কথা বলতে দেখেছি। কিন্তু এ বাড়িতে প্রতি সন্ধ্যায় মা বেরিয়ে যেতেন বাবার সাথে ক্লাবে কিংবা পার্টিতে। মা বেরিয়ে যাবার পরেও সারাবাড়িতে ছড়িয়ে থাকতো কড়া বিদেশী পারফিউম এবং প্রসাধনীর গন্ধটা আরও বেশ কিছুক্ষণ। আমি সেই গন্ধ নিয়ে সারা সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াতাম। মা ফিরতেন গভীর রাতে। আমি তখন গভীর ঘুমে আছন্ন, এমনই ভাবতেন হয়তো তারা। কিন্তু মা কোনোদিন জানবেনা, মা না ফেরা পর্যন্ত আমি কোনদিনই চোখের পাতা এক করতাম না। আমার ঘর থেকে জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া বড় গেটটাতে চোখ মেলে বসে থাকতাম ঐ প্রায় মধ্যরাতেও, অপেক্ষায় থাকতাম কখন দেখা যাবে গাড়ির হেড লাইট বা শোনা যাবে নতুন বাবার বড় গাড়িটার হর্ণ ।
ঠিক ও বয়সটাতে আরও বুঝে গেলাম এই সুবিশাল পৃথিবীতে আমার পথচলা আমার একারই। আমাকে একাই লড়তে হবে। রমেশচাচা প্রায়ই বলতেন, পড়ালেখা করে বড় হও আর কোনো দুঃখ থাকবে না মা। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম আমি তো কখনও উনাকে আমার কোনো দুঃখ বলিনি। তবে উনি কেনো আমাকে এত দুঃখী ভাবেন সব সময়! এ বাড়িতে আসার আগে আমি কিছুদিন লিটিল জ্যুয়েলস স্কুলে গিয়েছিলাম কিন্তু এখানে আসার পরে আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হলো অগ্রনী স্কুলে। একে নতুন পরিবেশ, তার উপরে নতুন স্কুল, বন্ধুরাও নতুন। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে আমার ক্লাসের সহপাঠীরা বেশিভাগই আমাকে ভীষন পছন্দ করে ফেললো।
স্কুলের বুলি আপা একদিন একটি রচনা লিখতে দিলেন, বিষয় ছিল আমগাছ। আমি আগে কোনোদিন রচনা লিখিনি। তারপরও ভাবনা আর কল্পনা দিয়ে লিখে ফেলেছিলাম একটি একাকী আমগাছের কাহিনী। বুলি আপা বিস্মিত হলেন! উচ্ছ্বসিত হলেন। আমার লেখায় উনার মুগ্ধতা বা অনাদরে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া এই আমির এত আদর, এত প্রশংসাতে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম আমি। বুঝে গেলাম নিজেকে গড়ে তোলার লড়াইটাই হলো নিজের ভেতরের সকল শক্তি বা মেধাকে কাজে লাগিয়ে তোলা। এই একমাত্র অবজ্ঞার জবাব হতে পারে।
এ বাড়িতে এক বিশাল আবিষ্কার আমার, তিনতলার বারান্দার কোণে এদের সুবিশাল লাইব্রেরী রুম। দেশী বিদেশী কত রকম বই যে তাকে থরে থরে সাজানো। একটা মইও আছে, উঁচু তাকগুলো হতে বই নামাবার জন্য। রোজ স্কুল থেকে ফিরেই আমার কাজ ছিলো চুপ করে একটা বই এনে নিজের রুমের লাগোয়া বারান্দায় বসে পড়া। আবার চুপি চুপি সেখানেই ফিরিয়ে রেখে আসা। পথের পাঁচালী, শরৎচন্দ্র, সঞ্চয়িতা কিংবা মেঘনাদবদ কাব্য সবই পড়তাম আমি বুঝে বা না বুঝেই। রবিঠাকুরের কবিতার "মাকে আমার পড়ে না মনে" পড়ে চোখের জলে বুক ভাসাতাম। কবিতার ভেতরের মেয়েটা তখন আমি।

violin
একদিন লাইব্রেরী রুমের তাকের ড্রয়ারে আবিষ্কার করলাম আমি এক আশ্চর্য্য যন্ত্র। সুদৃশ্য কাঠের তৈরী বাদ্যযন্ত্রটিতে ছিলো তারের ছড়া। আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করতে গম্ভীর এক অদ্ভুত স্বর বেরুলো। তাড়াতাড়ি রেখে দিলাম ড্রয়ারেই। এর কিছুদিন পরেই খুব কাকতালীয়ভাবেই ঐ যন্ত্রটির সাথে পরিচয় হলো আমার। বিদেশ থেকে এলেন আমার নতুন বাবার একমাত্র বড় বোন। মা যেমন তার মোটা সোটা রাশভারী, মেয়ের সাথে তার একটু মিল নেই। স্কুল থেকে ফিরে আমি দেখলাম এক ছিপছিপে ফরসা ববকাট চুলের মহিলাকে। আগেই জানতাম উনি আসবেন কাজেই আঁচ করে নিলাম। উনি খুব হাসি খুশি আর চঞ্চল চরিত্রের মানুষ ছিলেন। আমাকে দেখেই কাছে ডাকলেন। বললেন, আহা কি মিষ্টি মুখটা। মায়ের মতই হাসি, চোখ নাকের আদল পেয়েছে কিন্তু রঙটা পায়নি। চমকে উঠলাম আমি। মনে পড়ে গেলো বাবাকে গালমন্দ করা মায়ের সেই উপমা আবলুশ কাঠ রঙ!
একদিন বিকেলে উনি উনার বেহালার খোঁজ করলেন। বেহালা কই আমার বেহালা! কেউ খুঁজে পাচ্ছিলো না তার বেহালা। আমি জানতাম কিন্তু ভয়ে বলিনি। শেষ পর্যন্ত নিজেই আবিষ্কার করলেন তিনি। ধুলো ঝেড়ে মুছে বাঁজাতে বসলেন। কি মায়াময় সুর। কোন অচীনদেশে নিয়ে যায় মন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম আর সেদিনই জানলাম এটি বাজাতে একটি কাঁঠির মত অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। আমার আগ্রহ দেখে ঝুমকি ফুপু আমাকে শিখাতে বসলেন। খুব অল্পদিনেই আমি শিখে ফেললাম । সুর তুলে বাজাতে শুরু করলাম পুরানো সে দিনের কথা, ভুলবি কিরে হায়, ও সেই চোখের দেখা প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়!
না কিছুই আসলে ভুলে যাওয়া যায় না । স্মৃতি সে দুখের হোক বা সুখেরই সবই হীরা, মণি, মুক্তা হয়ে জ্বলজ্বল জ্বলে মনের গহীন কুঠুরীতে।

পর্ব - ৫

ঝুমকি ফুপু ফিরে যাবার আগে এক ছুটির দিনের সকালে আমাকে নিয়ে চললেন পাড়ার সঙ্গীত বিদ্যায়তনে। সেখানে নাচ, গান, তবলা, এমনকি পিয়ানো শেখানোরও বন্দোবস্ত ছিলো কিন্তু বেহালা শিখানোর কোনো শিক্ষক ছিলেন না। তবে ঐ স্কুলের মালিক ফুপুর বিশেষ পরিচিত হওয়ায় উনি কথা দিলেন যত শীঘ্র সম্ভব উনি একজন বেহালা শিক্ষকের ব্যবস্থা করবেন। ফুপুর যাবার তখনও সপ্তাহ দুয়েক বাকী ছিলো । তার আগেই বেহালা শিক্ষকের ব্যবস্থা হয়ে গেলো। ঝুমকি ফুপু যাবার আগে তার সাধের বেহালাখানা আমাকে দিয়ে গেলেন। বেহালাতে কারুকার্য্য মন্ডিত হরফে খোদাই করা ছিলো গুলশান আরা চৌধুরী। বেহালাটা আজ পুরোনো কালচে হয়ে গেছে। ঝুমকি ফুপুও আজ বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে। তবুও সেসব স্মৃতি লিখতে গিয়ে মনে হয় যেন সেদিনেরই কথা।
এই বিশাল মৃত্যুপুরী টাইপ বাড়িটাতে ঝুমকি ফুপু ছিলেন যেন এক আলোর ঝলক। নতুন বাবা, তার রাশভারী গুরু গম্ভীর মা এবং এই বাড়িতে পা দেবার পর হতে আমার চির অচেনা মায়েরও আরও বেশি অচেনা হয়ে পড়া ও দূরে সরে যাওয়া এমন একটি দুর্বোধ্য অস্বয়াস্তিকর পরিবেশে ঝুমকি ফুপু ছিলেন এক দমকা হাওয়া। সতেজ প্রাণবন্ত এক ঝলক নিঃশ্বাস টেনে নেওয়া মাধবীলতা ফুলের ঘ্রাণ। ফুপুর ফিরে যাওয়াটা তাই বিশেষ কষ্টের ছিলো আমার কাছে। তবে বেহালায় হাত দিলেই আমি এক অদ্ভুত কোমল স্পর্শ পেতাম। সে ছিলো তার স্পর্শ। ঝুমকি ফুপু যাবার আগে আমাকে একটা পারফিউম দিয়ে গিয়েছিলেন "লেডি ম্যানহাটন"। ফুপুর কথা মনে হলেই আমি সেই পারফিউমর বোতল খুলে তার গন্ধ নিতাম। অনেক রাতেও বন্ধ ঘরের ভেতরটা ভরে যেত ফুপুর গন্ধে।
তখনকার দিনে ছিলো শুধুই টি এন্ড টি ফোন। ফুপু বিদেশ থেকে ফোন দিতেন ছুটির দিনের দুপুরে। মায়ের সাথে কথা বলাটাই তার উদ্দেশ্য ছিলো। কিন্তু তার ফোনের রিংটা পেলেই আমি কি করে যেন বুঝে যেতাম এটা ফুপুর ফোন। দৌড়ে গিয়ে ফোনটা ধরতে ইচ্ছে হত আমার। তবে কোন সে অদৃশ্য অজানা নিষেধের বারন আমাকে আটকে দিত। আমি অতি কষ্টে নিজেকে সামলে রাখতাম। শুধু কান খাড়া করে রাখতাম কখন ফুপু আমাকে ডাকবেন একটু কথা বলার জন্য। আমাকে নিয়ে ফুপুর এত আদিখ্যেতা তার মায়ের একদমই পছন্দ হত না। তবুও একমাত্র জেদি মেয়েকে তিনি মনে মনে ভয় পেতেন। পৃথিবীর কাউকে যে উনি ভয় পেতে পারেন এটা আমার কখনও মনে হয়নি ফুপুর সাথে তার আচরণ দেখার আগে। তবে ফুপু বেশ জিদ্দি ছিলেন এবং কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ফুপুকে যে সবাই বাড়িতে একটু সমীহ করে চলতো তা আমি বেশ বুঝতাম। তবে কারণটা তখনও অজ্ঞাত ছিল।
আমার প্রায়ই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই আমি জানালায় বসে থাকতাম। নিস্তব্ধ রাতের তারায় ভরা আলোকিত আকাশ কালো রাতের কালীতেও যেন ঢেলে দেয় এক হালকা জ্যোতস্নার ছায়া। সাদা সাদা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পূর্নিমার চাঁদের অপূর্ব সৌন্দর্য্যের খেলা আমি সে সময়গুলোতে খুব অবাক হয়ে দেখেছি।
একদিন সকালে উঠে দেখলাম সারাবাড়িতে আনন্দের রেশ। ডাইনিং টেবিল বোঝাই মিষ্টির বাক্স। নতুন বাবার মায়ের মুখে আনন্দোচ্ছ্বাস। আমি কাউকেই কিছু জিজ্ঞাসা না করে নিজেই পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ শিউলি আমাকে আড়ালে ডেকে বললো, জানো একটা খুশির সংবাদ আছে। আমি বললাম, কি? সে জানালো আমার নাকি নতুন ভাই বা বোন হতে যাচ্ছে। নতুন ভাই বা বোন, সেই আনন্দে আমার মন ভরে উঠলো। আমার ছোট ভাই বা বোন কি হবে সে? আমাকে কি বলে ডাকবে? আমি তাকে অনেক আদর করবো অনেক ভালোবাসবো। আমার খেলার সাথী হবে সে। নতুন ভাই বা বোনের স্বপ্নে আমি পরবর্তী কিছুদিন মশগুল হয়ে রইলাম।
এরপর এলো স্কুলে বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পালা। আমাদের ক্লাসের মেয়েরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সামান্য ক্ষতি" কবিতাটির নৃত্যনাট্য করবে। ক্লাসের শেষের দুই পিরিয়ড রিহার্সেল হবে। আমরা সকলে অপেক্ষা করছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই নাচ শিখে, অনেকেই গান, অনেকেই আবৃত্তি জানে। আমিই মনে হয় একমাত্র মানুষ যে কিছুই জানিনা। কার কি প্রতিভা আছে তা জানার পরে আমাদের কালচারাল হেড শামীম আপা সিলেক্ট করতে বসলেন কে কোন পার্ট পাবে। সবাইকে সব পার্ট দেবার পরে উনি আমাকে বললেন ঐ নির্মম রাজমহিষীর অংশটুকু আমাকে করতে হবে। আমি সামান্য ক্ষতি কবিতাটি আগেই পড়েছিলাম এবং ঐ রাজমহিষীর উপরে আমার বরাবরের ঘৃণা ছিলো বরং মহানুভব ভূপতি বা রাজার উপর ঐ বয়সে আমার অশেষ অগাধ শ্রদ্ধা ভালোবাসার শেষ ছিলনা। তবে শামীম আপা আমাকে বললেন, রাজমহিষীর চরিত্রটি এখানে নির্মম হতে পারে তবে এ চরিত্রের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব আমার। আমি আপার কথা মেনে নিলাম।
রিহার্সেলের প্রথম দিনটিতেই বাঁশীর সুরে সুরে কবিতার সাথে সাথে কি করে পা মিলিয়ে চলতে হবে মানে এই নৃত্যনাট্যের প্রথম অংশের নাচের সাথে সখীদের নিয়ে এইটুকু শিখতে গিয়েই আমি যেন নৃত্যের প্রেমে পড়লাম। গভীর প্রেমে পড়লাম আমি এই শিল্পের। নাচ শিখাতে এসেছিলেন মুনমুন আহমেদ। আমি উনার তেজস্বিনী ঋজু দেহ, দীপ্ত ভঙ্গিমা কিংবা নম্র কোমল প্রতিটি ভঙ্গির সাথে এমনভাবেই মিশে গেলাম যে তখন আমার ধ্যান জ্ঞান স্বপ্নে নেচে চলেছিলাম ঠিক উনার মত করেই।
আজও মাঝে মাঝেই প্রখর শীতে, মাঘ কিংবা পৌষে গরম জলের উষ্ণতায় স্নান সেরে উঠেও মনে পড়ে যায় -


স্নান সমাপন করিয়া যখন কূলে ওঠে নারী সকলে
মহিষী কহেন উহু শীতে মরি-
সকল শরীর উঠিছে শিহরি
জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী
শীত নিবারিব অনলে....

পর্ব - ৬

মাস ছয়েকের মধ্যেই এই বাড়ির পরিবেশ এবং নতুন নতুন যে সব ঘটনার সাথে পরিচয় হলো তা আমার জন্য যেমনই ছিলো চমকপ্রদ তেমনই ছিলো অজানাও। মায়ের আচরণে বেশ বড়সড় এক পরিবর্তন আসলো যেন। মাকে যদিও আগেও তেমন খুব বা বেশি স্নেহশীলা হতে দেখিনি বরং দেখেছি কি এক অকারণ ক্ষোভ আর রাগ পুষে রাখতেন সর্বদা মনে মনে। আমার বাবার প্রতি, আমার দাদুর বাড়ির প্রতি, বিশেষ করে আমার দাদুর প্রতি। যেন উনি পছন্দ করে ও বাড়িতে মাকে এনে অনেক বড় অপরাধই করে ফেলেছিলেন। এ বাড়িতে প্রবেশের পর হতেই মায়ের মাঝে সেই ক্ষোভের ছায়াটা দেখিনি বটে তবে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মায়ের সাথে আমার দূরত্ব বাড়তে শুরু করলো। আমার মনে হত মা ইচ্ছাকৃতভাবেই আমাকে এড়িয়ে চলেন এখানে। হয়তো অনাহুত রবাহুত এই আমির প্রতি এ বাড়ির সকলের বিরূপ মনোভাব দেখেই এই বিরূপতা দেখানোর শুরু। এটা হয়ত আমার ভালোর জন্যই, এমনও মনে হত আমার। আমার প্রতি বেশি ভালবাসা দেখালে তারা যদি আবার বিরক্ত হয় এমনটা ভেবেই মা হয়তো দূরে থাকতেন আমার থেকে।
তবে একটা সময় আমার মনে হলো, আসলে মা তার অতীত ভুলতে চান। মা আমার নানুবাড়ির সাথেও যোগাযোগ রাখতেন না তেমন। আমার বাবার অন্তর্ধান বা মাকে ছেড়ে যাওয়া ব্যাপারটাকে মা কখনও সহজভাবে নিতে পারেননি বরং সেটা তিনি তার হার ধরে নিয়েছিলেন। এই কারণে অতীতের সকল কিছুর সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করার জন্য তার ছিল সকল প্রচেষ্টা। কিন্তু আমি? আমাকে ছিন্ন করবেন কিভাবে! আমাকে ছিন্ন করতে পারেননি তিনি । এই একটি মাত্র নাড়ীর বাঁধনকে। তবে আমি তার চোখের সামনে থাকলেই সেই অতীত স্মৃতির কালো সুতোয় টান পড়তো হয়তো তার। তাই তার বিরক্তিটাও বাড়ছিলো নিজের অজান্তেই। এই ভাবনাটা আমার প্রকট হলো মায়ের এই সময়টাতে। উনার ধারে কাছে গেলেও উনি কি রকম যেন বিরক্ত হতেন, বলতেন কি ব্যাপার রেস্ট নাওনি কেনো? পড়তে বসনি কেনো? যাও চুল বাঁধ, মুখ ধোও। মুখখানা তো একদম কালি মাড়া করে রেখেছো। চমকে উঠতাম আমি। আমার মনে হত আমাকে দেখলে বাবাকে মনে পড়ে যাচ্ছে মায়ের। মায়ের জীবনের চরম হার। বাবা মাকে রেখে চলে গেছেন। এই ব্যাপারটা অসহ্য মানষিক পীড়ার কারণ ছিলো তার।
মা আমার থেকে একেবারেই দূরে চলে গেলেন সেটা নতুন বাবুটা জন্মের পর পরই। কি সুন্দর লাল টুকটুক পুতুল পুতুল বাবু। সারাদিন ঘুমায়। ঘুমের মাঝে হাসে, কাঁদে। মাঝে মাঝে জেগে উঠে চিল চিৎকারে কান্না করে। আমি কাছে গেলেই মা বলেন, ধরো না ধরোনা। ব্যথা পাবে, পড়ে যাবে। যাও নিজের ঘরে যাও। ঘুমাও, পড়তে যাও। নতুন বাবার মাও ছুটে আসেন। বাবুর আশে পাশে আমাকে দেখাটা উনারও যে পছন্দ না সে আমি বেশ বুঝতে পারি। বাড়িটা সারাদিনই অতিথি অভ্যাগতদের সমাগমে ভরপুর থাকে। কত রকম উপহার, কত রকম খাদ্য খানা, হাসি তামাশা, গল্প গুজব। ওদের মাঝে আমার উপস্থিতি ওদের জন্য বেশ অস্বয়াস্তিকর সে আমি আমার ঐ বয়সেও খুব বুঝে যাই।
একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম মোটা মত এক ভদ্র মহিলার সাথে নতুন বাবার মা উচ্ছ্বসিত হয়ে গল্প করছেন। আমার নাতনীটা তো হয়েছে যেন পরী। মায়ের মত গায়ের রঙ আর বাবার মত চেহারা পেয়েছে। আমার ছেলেও কি কম সুপুরুষ! ঐ মোটা মত ভদ্র মহিলা বললেন, তা বৌমার আগের ঘরের মেয়েটা কই? ডাকেন তো দেখি তাকে। দরজার কোনে থমকে দাঁড়ালাম আমি। আমার নতুন বাবার মায়ের মুখ সে প্রশ্নে আঁধার হয়ে এলো। বললেন, আছে কোথাও বা স্কুল থেকে ফেরেনি। এই এক আপদ। আমার ছেলে তো বউয়ের রূপে অন্ধ হয়ে বিয়ে করে আনলো, সাথে নিয়ে আসলো এক আবর্জনার বাক্স। কলিকাল। ছেলের মুখে চেয়ে কিছু কইতেও পারিনা সইতেও পারিনা।
আমার চোখ ভরে উঠলো জলে। আমি আবর্জনার বাক্স? আমিই যে সেই আবর্জনার বাক্স তা বুঝে উঠতে সময় লাগলো না আমার। একটি শীতল হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলাম আমি। শিউলী। আমার চোখ মুছিয়ে দিলো ওর শাড়ির আঁচলে। ওর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলাম আমি .....

পর্ব ৭-৮